পরিবেশ আইন `প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা`য় বিপর্যস্ত আইন

Tweet

environment Lawমানবাধিকার ডেস্ক:
পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আইন থাকলেও নেই তার যথাযথ প্রয়োগ। ফলে ক্রমেই বিপন্ন হচ্ছে আমাদের পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র। এমনকি মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ছে আমাদের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাগুলো।
পরিবেশের সংরক্ষণ ও বিপর্যয় রোধ করার জন্য সরকার ১৯৯৫ সালে একটি সামগ্রিক পরিবেশ আইন প্রণয়ন করে। এর আগের বিচ্ছিন্ন আইনগুলোকে আরো সমন্বিতভাবে ১৯৯৫ সালের আইনে সংকলিত করা হয়।  এর পরে ২০১০ সালে আইনটির বেশ কিছু বিষয় সংশোধন করা হয়। ১৯৯৫ সালে প্রণীত আইনেই কোনো বিশেষ এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার বিধান ছিল। তার আলোকে বেশকিছু এলাকাকে `প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা` ঘোষণা করা হয়।
কেবল আমাদের দেশীয় আইনেই নয়, আর্ন্তজাতিক আইনেও কোনো বিশেষ এলাকার গুরুত্ব বিবেচনা করে ও পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করার জন্য সেই এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার বিধান আছে।
কোনো এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার ঘোষণা করা হলে সেই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করার জন্য সরকারকে বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। সেই সাথে সেসব এলাকায় চলমান কর্মকাণ্ডের ওপর কিছু বিধি-নিষেধও আরোপ করা হয়।
তাছাড়া এলাকাটিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতও করা হয়। এসব বিধি-নিষেধ ও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে সেসব এলাকার পরিবেশ বিপর্যের হাত থেকে রক্ষা পায় ও সেই সাথে পরিবেশের উন্নয়নও সাধিত হয়। আমাদের দেশে ১৯৯৫ সালের আইনটি পাস করার পর বেশকিছু এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে, ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও নারায়নগঞ্জের শীতলক্ষা নদী।
ঢাকার গুলশান-বারিধার লেককেও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয় ২০০১ সালে। এছাড়া ঢাকার বাইরে দেশের বেশ কিছু এলাকাকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয় এগুলোকে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক এসব নদীকে ও এলাকাকে  সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এছাড়া এ আইনের আওতায় কক্সবাজারকেও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয় ১৯৯৯ সালে।
আইনে আছে, কোনো এলাকাকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলে, সেই এলাকায় সেটি প্রদর্শিত হবে। এটি সেই এলাকার দালিলিক বর্ণনা হিসেবেও বিবেচিত হবে। কিন্তু এমন নজীর সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে দেখা যায় না।
আইনে আরো আছে ,পরিবেশে অবক্ষয়ের কারণে কোনো এলাকার প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত হলে বা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা উক্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করতে পারে।
সরকার পাশাপাশি উক্ত এলাকাকে সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এ প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট এলাকার সীমানা ও মানচিত্র আইনগত বর্ণনার উল্লেখ থাকবে এবং এই সকল মানচিত্র ও আইনগত বর্ণনার
হাকালুকি হাওড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এছড়া সোনাদিয়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, কক্সবাজার ও টেকনাফের দ্বীপাঞ্জলও সংকটাপন্ন এলাকার তালিকাভুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পরও এসব এলাকার পরিবেশের কোনো উন্নয়নতো হয়ই নি, বরং একইভাবে বেড়েই চলছে পরিবেশ দূষণ।
এছাড়া, আইনানুযায়ী, ওইসব এলাকার জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও গ্রহণ করার কথা। কিন্তু ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাতো অনেক দুরের কথা, পরিবেশ সংরক্ষণের সর্বনিম্ন মানও বজায় রাখা হয় না এসব এলাকায়। আইনানুযায়ী সংকটাপন্ন এলাকায় কোনে ক্ষতিকর কাজ বা প্রক্রিয়া চালু রাখা যাবে না। আবার কোন কোন কাজ ক্ষতিকর হবে তাও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার নির্দিষ্ট করবে। পাশাপাশি এলাকাগুলোতেও সেই সব ক্ষতিকর কাজ যথাযথভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু প্রজ্ঞাপনে  থাকলেও বাস্তবে তা পালন করা হচ্ছে কিনা তা তদারক করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ক্রমেই বেড়ে চলছে ক্ষতিকর কাজের ফিরিস্তি।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পর সে এলাকার জন্য কোনো সংরক্ষণ নীতিমালা করা হয়না। আবার যা করা হয় তাও অনুসরণ করা হয় না। তাই এলাকাভিত্তিক পৃথকভাবে নিয়মনীতিও অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ প্রসঙ্গে সুন্দরবনের কথা বলা যেতে পারে। সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলো থেকে বালু উত্তোলন ও বন থেকে বৃক্ষ সংগ্রহে  বুলডোজারের ব্যবহার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এছাড়া যত্রযত্র বাঘ-হরিণ শিকারতো রয়েছেই। বিশেষ করে বুড়িগোয়ালীনি রেঞ্জের কলাগাজি ও চুনা নদী সংলগ্ন এলাকায় এসব কাজ সুন্দরবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। সুন্দরবনের জন্য পৃথক কোনো সংরক্ষণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। এখানকার জীব-বৈচিত্র ও প্রতিবেশ ক্রমেই হুমকির মধ্যে পতিত হচ্ছে। তার সাথে যোগ হচ্ছে রামপাল।
তাই, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও পরিবেশবাদী মনোভাব এক্ষেত্রে খুবই জরুরি।

Leave a Reply