বর্তমান সংবিধানে নির্বাচন হলে…

Tweet

constitutionসংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে যদি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে কে থাকবে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান? সে নির্বাচনে কি সবদল অংশগ্রহণ করবে? নির্বাচনকালে কি মন্ত্রিপরিষদ, সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা বহাল থাকবে? জনমনে ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
সংবিধান অনুসারে বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষে হবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। তাই এ সময়সীমা শেষ হওয়ার সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, এমনকি স্বপদে বহাল থাকবেন সংসদ সদস্যরাও। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহাল থাকা অবস্থায় কোনোভাবেই নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি।
এদিকে মহাজোট সরকারের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করলে তাতে অংশ নেবে না তারা।
রোববার দুপুরে রাজধানীর বনানীতে পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠক সূত্র জানা যায়, দলের চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে তাহলে একতরফা নির্বাচন করতে পারে আওয়ামী লীগ। আর একতরফা নির্বাচন হলে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ওই একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি এর দায় নিতে চায় না। তাই বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে, তাহলে জাপাও যাবে না।
এ অবস্থায় সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের অবস্থান যা-ই হোক সংবিধান অনুযায়ীই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
“সংবিধান থেকে এক চুলও নড়া হবে না” বলেও নিজের কঠোর অবস্থানের ‍কথা জানান দিয়েছেন তিনি।
এ সময় নির্বাচন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বিরোধী দলের দাবি (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা) উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ২৫ অক্টোবরের পর সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে বলে যে কথা তারা বলছে তা সত্য নয়। সাংবিধানিক সংকট তৈরি হওয়ার কোনো সুযোই নেই।
এ বক্তব্যের কিছুকক্ষণ পরই বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বর্তমান সংবিধানের আলোকে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাতে অংশ নেবে না বিএনপি।
সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে ১৭ আগস্টও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে একবার তো নির্বাচন শুরু হতে হবে।  সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বুই দিনের মধ্যে সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’
আর বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। তাই এ সময়সীমা শেষ হওয়ার সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। পদে থাকবেন থাকবে তার নেতৃত্বাধীন সংসদ সদস্যরাও।
ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে প্রধানমন্ত্রী বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচন হয়ে থাকে। ২০০৯ সালে ভারতীয় লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তার পদেই বহাল ছিলেন। ভারতীয় সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় ৫ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর সংসদ ভেঙে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময় দলীয় সরকারের অধীন এবং সংসদ রেখে নির্বাচন করার ব্যবস্থাটি ছিলো। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীতে তা বিলুপ্ত করা হয়। পরে আবার বিএনপি সরকার ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে আবার বহাল রাখেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তা পুনরায় বিলুপ্ত করা হয়।
২০০৯ সালে বর্তামান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে তা আবার বহাল রাখা হয়।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বার্হী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সরকার থাকে তাদের অধীনে নির্বাচন হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে আস্থা না থাকায় তা সম্ভব নয়। এ জন্য আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে উভয়দল ঐক্যমত্যে পৌছুতে পারে।
তবে নির্বাচনকালে ভারতের নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ এগিয়ে নেয়। স্বপদে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে না।
ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সংবিধান-স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ।
সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও স্বাধীন সংস্থা।
সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত।  তবে ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের সময় সংসদ বা মন্ত্রিসভা থাকবে কী থাকবে না, মন্ত্রিসভা থাকলে তার আকার কী হবে তা নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন আয়োজন করবে। নির্বাচনের যখন সময় হবে তখন রাষ্ট্রপতিই ঠিক করবেন সরকারের ধরন কি হবে বা সংসদ থাকবে কি না।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যখন সময় আসবে, আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করবো যে, এতো তারিখে আমরা নির্বাচন করতে চাই। তিনি যেভাবে নির্দেশ দেবেন সেভাবেই সব হবে। এই মন্ত্রিসভাই থাকবে বা মন্ত্রিসভা ছোট করতে হবে কি না বা কবে পার্লামেন্ট ডিজলভ করে দেবেন (ভেঙে দেবেন)সে সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারে থাকবে। সেভাবেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট করবে এবং নির্বাচন হবে।
কিন্তু সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে, (ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বুই দিনের মধ্যে; এবং(খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’
যদিও এ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়, ‘তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরুপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’
অর্থাৎ নির্বাচনকালীন সময়েও সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা অব্যাহত থাকবে। নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলীর মতে, যদি এ রকমই হয় তাহলে নতুন আচরণবিধি তৈরি করতে হবে।
এদিকে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদও একই কথা বলে।  ৫৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী থাকিবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেরুপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রী থাকিবেন। (২) প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন: (৩) যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।’
একই অনুচ্ছেদের (৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংসদ ভাংগিয়া যাওয়া এবং সংসদ-সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফার অধীন নিয়োগ দানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার অব্যবহিত পূর্বে যাঁহারা সংসদ-সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্যসাধনকল্পে তাঁহারা সদস্যরূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’
কাজেই বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনকালীনও বর্তমান সংসদ সদস্যদের স্বপদে বহাল থাকার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর বসছে নবম জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশন। এদিন বিকেল ৫ টায় অধিবেশন শুরু হবে। রোববার সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ১ দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন।
এটি চলতি বছরের চতুর্থ অধিবেশন।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। এই হিসেবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। আর মেয়াদ শেষের আগের তিন মাসের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগে মৌলিক বিষয়ে সমঝোতা না হলে সাংবিধানিক সংকট এবং নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হবে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতারা কি ভাবছেন তাও বোধগম্য নয়। এ অধিবেশনে যদি এ সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে আবার সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
তবে আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আশা করেন, নির্বাচনের আগেই উভয়পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হবে।

Leave a Reply